কোরআনে স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূলনীতি ।

মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করে যে ইসলামের শিক্ষা মেনে জীবনযাপন করলে একটা সুস্থ ও উন্নত জীবন লাভ করা যায়। পবিত্র কোরআন তিনটি জরুরি বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। আর এই নির্দেশনার আলোকে মানবজীবন সুখময় এবং শান্তিময় করার নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। মানবজীবনের সফলতার জন্য যে তিনটি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে সেগুলো হলো : ১. আধ্যাত্মিক। ২. মানসিক। ৩. শারীরিক স্বাস্থ্য। এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ের মধ্যেই আছে একটি প্রকৃত জীবনের চাবিকাঠি।

আধ্যাত্মিক সাফল্য মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিষয়ের ওপর একটা স্থিতাবস্থা তৈরি করে। তাই এটাকে ইসলামে প্রথম স্বাস্থ্যভিত্তি বলা হয়। আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য গভীরভাবে দেখতে গেলে মুসলমানদের জন্য ব্যক্তিক, জটিল ও স্বতঃসিদ্ধ একটা ধারণা। আর এর গুরুত্ব নির্ভর করে একজন মানুষ তার জীবনের লক্ষ্য কিভাবে বুঝতে শেখে। ইসলামে বস্তুগত দুনিয়ার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার কোনো বিরোধ নেই। আর একজন মুসলিমের জন্য আধ্যাত্মিক সফলতা আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ ব্যতিরেকে সম্ভব নয়। কোরআন বর্ণনা করে, আল্লাহর মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতি লাভ করে এবং সে দৃঢ় থাকে। জীবনের যেকোনো চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়টি মানুষকে শক্তি জোগায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘…যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ ও আখিরাতের দিনের প্রতি এবং নেক কাজ করেছে, তাদের জন্য আছে তাদের রবের কাছে প্রতিদান। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৬২)

আধ্যাত্মিকভাবে বলিষ্ঠ থাকার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর ইবাদত করা এবং আল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ পরিপালন করার মধ্য দিয়ে একজন মুসলিম আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতি লাভ করতে পারে। এই পাঁচ স্তম্ভ হলো, শাহাদাত বা ঈমান, প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ আদায়, জাকাত প্রদান, রমজানের রোজা পালন এবং হজ সম্পাদনের জন্য কাবাঘরে উপস্থিত হওয়া।

মানুষের আবেগগত বা মানসিক স্বাস্থ্য হলো একজনের আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম পর্যায়। এটি কোরআনের দ্বিতীয় উপকরণ। একজন মানুষের সুস্থ হার্টের সঙ্গে তার আবেগগত বা মানসিক স্বাস্থ্য জড়িত। এ বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে উপদেশ এবং অন্তরে যে ব্যাধি থাকে তার শিফা, আর মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫৭)

কারো অন্তর বা হার্ট যদি সুস্থ থাকে তাহলে সব বাধা-বিপত্তি এবং প্রতিকূলতা তার কাছে আশীর্বাদ মনে হয়। একজন মুমিন তার সব সমস্যায় ও প্রতিকূলতায় কোরআনের দিকে ফিরে যায় এবং তার মধ্যেই সমাধানের উপায় খোঁজে এবং এর মাধ্যমে মন ও মননের শান্তি তালাশ করে। একজন মুমিন আত্মার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য নিয়মিত কোরআন পাঠ করে, শুনে ও হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করে। 

কোরআনের তৃতীয় উপকরণ শারীরিক স্বাস্থ্য বলতে সাধারণ স্বাস্থ্য বোঝায়। ইসলাম প্রতিটি মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য সুষম খাবার এবং শরীরচর্চার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, জমিনে যা আছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৬৮)

মানুষের সুষম খাবার বা উন্নত খাবার কী হবে—তার নির্দেশনা আছে এই আয়াতে। মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তাআলা কতগুলো খাবার হারাম ঘোষণা করেছেন এবং এগুলো থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়াও স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য রোজা রাখার প্রতি ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং রোজাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শরীরচর্চার প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ইসলাম শারীরিকভাবে সচল থাকার ওপর জোর দিয়েছে। এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর স্মরণ ছাড়া যেকোনো কাজকে ইসলাম বিচ্যুতি বা অসতর্কতা বলে উল্লেখ করেছে। তবে চারটি কাজ এর ব্যতিক্রম। সেগুলো হলো আর্চারী, ঘোড়ার প্রশিক্ষণ, পরিবারের কারো সঙ্গে খেলা করা এবং সাঁতার শেখা।’ (তাবরানি)

ইসলামে সুস্বাস্থ্য, শক্তি-সামর্থ্য অর্জন এবং শরীরের সামগ্রিক উন্নতির জন্য নিজেদের শারীরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। দৈনিক পাঁচবার নামাজের মাধ্যমে শরীরচর্চা তার একটি প্রকৃষ্ট উপায়। এর মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নড়াচড়া হয় এবং মাংসপেশি প্রসারিত হয়। এতে শরীরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং স্বাস্থ্য ভালো থাকে। নামাজের মাধ্যমে ইবাদতের প্রতি বেশি মনোযোগী হতে হয় এবং আল্লাহর স্মরণে গভীর মনোনিবেশ করতে হয়। আর এই কাজটিতে মানুষের মানসিক ও শারীরিক চাপ অপসারিত হয়। যদি শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য যেমন প্রবল হয়, তেমনি তার মধ্য থেকে মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা বিদূরিত হয়।

আসলে মুসলমানরা প্রতিদিনের আমল, ইবাদত ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষার বিষয়টি শিক্ষা লাভ করে। আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণের মাধ্যমে, সুষম খাবার গ্রহণ এবং শরীরচর্চার মাধ্যমে মুসলমানরা আধ্যাত্মিক উন্নতি, আত্মার প্রশান্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি নিশ্চিত করে। কোরআন উল্লিখিত এসব উপকরণ পরিপালনের মাধ্যমে জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি ঘটানো এবং প্রতিকূল পরিবেশে চাপমুক্ত থাকার প্রতি দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সাবেক ডিএমডি ইসলামী ব্যাংক এবং বর্তমানে কো-অর্ডিনেটর।

Buy Our Premium Quality Hijab

Feathers – Be Your Own Label.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *