২০২০: স্বাস্থ্যের যে যে রোগ চিনিয়ে দিল মহামারী

স্বাস্থ্য সুরক্ষার যে কাঠামো পৃথিবীর মানুষ এতদিনে গড়ে তুলেছিল, ২০২০ সালে তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে একটি ভাইরাস; বাংলাদেশও সেই সঙ্কটের বাইরে থাকেনি।

কোথায় কোথায় প্রস্তুতির অভাব ছিল, তা যেমন এই মহামারীর মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি বেরিয়ে এসেছে স্বাস্থ্যখাতের কিছু অনিয়ম আর দুর্নীতির তথ্য।  

নতুন এই করোনাভাইরাসের উৎস এখনও মানুষের অজানা; এর কোনো ওষুধ এখনও আবিস্কার করা যায়নি। কিছু টিকা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের হাতে তা পৌঁছাতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

গতবছর ডিসেম্বরের শেষে চীনের উহানে নতুন ধরনের এক নিউমোনিয়া ধরা পড়ে, যাদের কারণ হিসেবে নতুন এক করোনাভাইরাসকে চিহ্নিত করা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি থাইল্যান্ডে নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয়।

শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ে এ ভাইরাস ১ লাখের বেশি মানুষকে আক্রান্ত এবং চার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটানোর পর মার্চের ১১ তারিখ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ সঙ্কটকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করে।

ততদিনে নতুন এ করোনাভাইরাস বাংলাদেশেও পৌঁছে গেছে; ৮ মার্চ প্রথম তিনজনের শরীরে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর।

ততদিনে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক; লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধে গোটা দুনিয়া অচল করে দিয়েও থামানো যায়নি ভাইরাসের বিস্তার। ধনী বা গরিব- কোনো দেশই নতুন এ রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা বলয় গড়তে সফল হয়নি।

৮ মার্চ থেকে ২৬ ডিসেম্বর- এই সাড়ে নয় মাসে সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে ৫ লাখ ৮ হাজার মানুষের দেহে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে; তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৪২৮ জনের পরিবারকে ২০২১ সাল শুরু করতে হবে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে।

অতি ছোঁয়াচে এই ভাইরাস থেকে রক্ষার উপায় হিসেবে মাস্ক ব্যবহারে কথা বলা হচ্ছিল শুরু থেকে। সেই মাস্ক নিয়ে কেলেঙ্কারি ছিল মহামারীর এই বছরে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

তারপর করোনাভাইরাসের পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথকেয়ারের জালিয়াতি-প্রতারণা দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসনকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।

মহামারীর সঙ্কটের শুরুতে পরীক্ষার ব্যবস্থা, সুরক্ষা সামগ্রী, হাসপাতালের আইসিইউ শয্যা, অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভেন্টিলেটরসহ জীবনরক্ষাকারী কিছু চিকিৎসা উপকরণের অপ্রতুলতা ছিল। ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে ওঠা গেছে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে শুরুতে সমন্বয়েরও অভাব ছিল। সেই সুযোগে সে সময় রোগটি বেশি ছড়িয়েছে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, সংক্রমণের শুরুর প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে করনীয় ঠিক করা গেলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন ‘সময়মত ও সঠিকভাবে’ শুরু করা যায়নি অনেক ক্ষেত্রে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গঠিত সরকারের জাতীয় কারিগরী পরামর্শক কমিটি এই সদস্য বলেন, “নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর কাজে দেরি হয়েছে, নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষাও হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় কম। দেশের সব এলাকা থেকে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রয়োজনীয় নমুনা পরীক্ষা হলে ফলাফল বিশ্লেষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হত।”

পাশাপাশি এ ধরনের রোগের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতিতেও ‘ঘাটতি ছিল’ মন্তব্য করে ডা. নজরুল বলেন, “এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় আইসিইউ নিশ্চিত করতে পারিনি। মহামারীর মধ্যে ননকোভিড রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি।”

আর কোভিড-১৯ প্রতিরোধে দেশের জনগণকে নিয়ম মানতে উদ্বুদ্ধ করতে না পারাটাকে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন এই চিকিৎসক।

“আমরা তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারিনি, অথবা তারা নিজেরাই নিয়ম মানতে চায়নি। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করতে পেরেছি। কিন্তু গত নয় মাসে আমরা সবার মাস্ক পরার অভ্যাস তৈরি করতে পারিনি। তার মানে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল ছিল।”

এরকম একটি মহামারী সামাল দেওয়ার জন্য পুরো বিশ্বই যেখানে অপ্রস্তুত ছিল, সেখানে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ‘মোটামুটি ভালো’ করেছে বলেই মনে করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এবং করোনাভাইরাস মোকাবেলা গঠিত ট্রিটমেন্ট প্রটোকল কমিটির সদস্য সচিব ডা. আহমেদুল কবীর।

তিনি বলেন, “এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ ভালোই ম্যানেজ করতে পেরেছে। তবে সামনে সতর্কতার জায়গাটায় ঠিক থাকতে হবে।

“এই রোগের এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা নেই। ভ্যাকসিন এখনও হাতে পাইনি, সামনে পেলেও সবাইকে দিতে সময় লাগবে। এ কারণে সংক্রমণ রোধে নজর দিতে হবে। মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।”

ভাইরাস ইতালি থেকে বাংলাদেশে

চীন থেকে করোনাভাইরাস অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়া শুরু করলে বিভিন্ন দেশ সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা শুরু করে।

বাংলাদেশ সরকারও ২১ জানুয়ারি চীন ফেরত সব যাত্রীর এবং ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের সব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করে। সেজন্য দেশে সব বিমান, স্থল ও সমুদ্রবন্দরে বসানো হয় থার্মাল স্ক্যানার।

২১ জানুয়ারি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে চীনের উহান থেকে আসা দুজন ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করা হয় আইইডিসিআরে, তবে তারা আক্রান্ত ছিলেন না। সেটাই ছিল দেশে করোনাভাইরাসের প্রথম পরীক্ষা।

৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত ১১৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে আইইডিসিআর। প্রতিদিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে হালনাগাদ খবর জানানোর পাশাপাশি সচেতনতামূলক তথ্য জানানো ব্যবস্থা হয়।

৮ মার্চের সংবাদ সম্মেলনে দেশে প্রথমবারের মত তিনজনের শরীরে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানান আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

প্রথম শনাক্ত তিনজনের মধ্যে দুজন ছিলেন পুরুষ, একজন নারী। পুরুষ দুজন ইতালির দুটি শহর থেকে দেশে ফিরেছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের সংস্পর্শে এসে পরিবারের ওই নারী সদস্য আক্রান্ত হন।

এর ঠিক ১০দিন পর ১৮ মার্চ করোনাভাইরাসে দেশে প্রথম মৃত্যুর খবর জানানো হয় আইইডিডিআরের সংবাদ সম্মেলনে। বিদেশফেরত সেই বাংলাদেশি নাগরিকের বয়স ছিল সত্তরের বেশি।

যেহেতু কোনো ওষুধ জানা নেই, সংক্রামক এ রোগ থেকে বাঁচতে ঘন ঘন হাত ধোয়া ও মাস্ক পড়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছিল শুরু থেকেই। দেশে যখন প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ল, বিক্রির চাপে আর মজুদদারির কারণে বাজার থেকে উধাও হয়ে গেল মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভসসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী, যেগুলো আগে স্বাস্থ্যকর্মীরাই ব্যবহার করতেন।   

অনেকে চাল-তেলের মত নিত্যপণ্য কিনেও ঘরে মজুদ করতে শুরু করছেন। কেবল বাংলাদেশে নয়, এই আতঙ্ক আর কেনাকাটার প্রবণতা দেখা গেল অনেক দেশেই। চীনের আদলে লকডাউন শুরুর পর ইউরোপের অনেক দেশে টয়লেট পেপার মজুদ করারও প্রবণতা দেখা গেল।

www.umchltd.com

One thought on “২০২০: স্বাস্থ্যের যে যে রোগ চিনিয়ে দিল মহামারী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *